মহাকাশ গবেষণায় আমরা এমন এক যুগে প্রবেশ করছি যা কল্পবিজ্ঞানকেও হার মানায়। সম্প্রতি ইউরোপিয়ান স্পেস এজেন্সির (ESA) ‘ইউক্লিড’ টেলিস্কোপ আমাদের গ্যালাক্সির, অর্থাৎ মিল্কিওয়ের একদম বুকের ভেতরের একটা অসাধারণ ছবি তুলেছে। ছবিটা শুধু বিশাল নয়, রীতিমতো চোখ ধাঁধানো—প্রায় ৬ কোটি নক্ষত্রের আলো সেখানে জ্বলজ্বল করছে। মজার ব্যাপার হলো, ইউক্লিড কিন্তু এই নির্দিষ্ট কাজটির কথা মাথায় রেখে বানানো হয়নি। এর মূল লক্ষ্য ছিল মহাবিশ্বের সেই অদৃশ্য শক্তিগুলোকে বোঝা, যেগুলো আমাদের এই ব্রহ্মাণ্ডের প্রায় ৯৫ ভাগ দখল করে আছে। বিজ্ঞানীদের মতে, আমাদের চেনা জানা সাধারণ পদার্থ মহাবিশ্বের মাত্র ৫ শতাংশ। বাকি ৭০ শতাংশ জুড়ে আছে ডার্ক এনার্জি বা গুপ্ত শক্তি, যা প্রতিনিয়ত মহাবিশ্বের সম্প্রসারণকে ত্বরান্বিত করছে। আর ২৫ শতাংশ হলো ডার্ক ম্যাটার, যা গ্যালাক্সিগুলোর চারপাশে এক অদৃশ্য আস্তরণ তৈরি করে রাখে।
গ্যালাকটিক বালজ নামের গ্যালাক্সির এই প্রচণ্ড ভিড়ভাট্টাপূর্ণ অংশে আলাদা আলাদা তারাকে চিহ্নিত করা চাট্টিখানি কথা নয়। কিন্তু ইউক্লিডের অত্যন্ত সংবেদনশীল ক্যামেরা সেই অসাধ্য সাধন করেছে। গত বছরের মার্চে টানা ২৬ ঘণ্টা পর্যবেক্ষণ করে ৯টি ফ্রেম বা ‘পয়েন্টিং’ জোড়া লাগিয়ে এই মোজাইক ছবিটি তৈরি করা হয়। এর প্রত্যেকটি ফ্রেম আকাশের পূর্ণিমার চাঁদের চেয়েও বড় এলাকা জুড়ে বিস্তৃত।
এই ছবি শুধু দেখতে সুন্দর তা নয়, এর আসল গুরুত্ব অন্য জায়গায়। ম্যানচেস্টার ইউনিভার্সিটির অ্যাস্ট্রোফিজিসিস্ট ড. ইমন কেরিন্সের মতে, এটা এক্সোপ্ল্যানেট বা সৌরজগতের বাইরের গ্রহ আবিষ্কারের এক নতুন যুগের সূচনা। তার ভাষায়, ইউক্লিডের এই ডেটা অনেকটা দৌড়ের শুরুতে পিস্তলের গুলির মতো কাজ করেছে। বর্তমানে আমরা প্রায় ৬,০০০ এক্সোপ্ল্যানেটের কথা জানি, কিন্তু ইউক্লিড আমাদের এক লাখেরও বেশি নতুন গ্রহের সন্ধান দিতে পারে।
নতুন গ্রহ খোঁজার এই পদ্ধতিতে ‘মাইক্রোলেন্সিং’ এক দারুণ ভূমিকা রাখে। ধরুন, একটা দূরের তারার সামনে দিয়ে যখন অপেক্ষাকৃত কাছের আরেকটা তারা পেরিয়ে যায়, তখন সামনের তারার মহাকর্ষ বল পেছনের তারার আলোকে বাঁকিয়ে দেয়। ফলে পেছনের তারাটিকে হঠাৎ বেশ উজ্জ্বল দেখায়। আর সামনের তারার চারপাশে যদি কোনো গ্রহ চক্কর কাটে, তবে তার বাড়তি মহাকর্ষের কারণে আলোর এই উজ্জ্বলতায় একটা সূক্ষ্ম পরিবর্তন আসে। এই পদ্ধতিকে কাজে লাগিয়েই আগামী আগস্টে নাসা তাদের ‘ন্যান্সি গ্রেস রোমান’ স্পেস টেলিস্কোপ উৎক্ষেপণ করতে যাচ্ছে। নাসার প্রথম চিফ অব অ্যাস্ট্রোনমির নামে নামকরণ করা এই টেলিস্কোপটি প্রায় দেড় হাজার নতুন মাইক্রোলেন্সিং এক্সোপ্ল্যানেট খুঁজে পাবে বলে আশা করা হচ্ছে।
ভিনগ্রহের এই অন্তহীন তল্লাশিতে বিজ্ঞানীরা এমন কিছু আবিষ্কার করছেন যা রীতিমতো তাজ্জব করার মতো। এই যেমন ধরুন, সম্প্রতি দুটি রাক্ষুসে ‘সুপার-পাফ’ গ্রহের সন্ধান মিলেছে। এদের আকার জুপিটারের মতো বিশাল, কিন্তু ওজন? আমাদের অতি পরিচিত হাওয়াই মিঠাই বা ক্যান্ডি ফ্লসের চেয়েও হালকা!
পৃথিবী থেকে প্রায় ১,১১০ আলোকবর্ষ (এক আলোকবর্ষ মানে প্রায় ৯.৭ ট্রিলিয়ন কিলোমিটার) দূরে ‘ভোলান্স’ বা উড়ন্ত মাছ নক্ষত্রমণ্ডলে এই দুই ভাইবোন—TOI-791 b এবং TOI-791—তাদের মাতৃনক্ষত্রকে প্রদক্ষিণ করছে। অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের ড. জর্জ ড্র্যান্সফিল্ড বিষয়টাকে খুব চমৎকারভাবে বুঝিয়েছেন। তিনি জানান, শেভিং ফোমের ক্যান থেকে সদ্য বের করা এক দলা ফোমের ঘনত্ব যতটা, এই গ্রহগুলোর ঘনত্বও ঠিক ততটাই। প্রতি ঘন সেন্টিমিটারে এদের ঘনত্ব মাত্র ০.০৫ গ্রাম। একটু তুলনা করলেই ব্যাপারটা পরিষ্কার হবে—আমাদের পৃথিবীর ঘনত্ব এর চেয়ে ১০০ গুণেরও বেশি (৫.৫ গ্রাম/ঘন সে.মি.), আর খোদ জুপিটার এদের চেয়ে প্রায় ৩৫ গুণ বেশি ঘন।
গত এক দশক ধরে নাসার ‘টেস’ (TESS) স্যাটেলাইটের ডেটা ঘেঁটে এই গ্রহগুলোর খোঁজ মিলেছে। বিজ্ঞানীরা ধারণা করছেন, এদের মূল উপাদান সম্ভবত হাইড্রোজেন আর হিলিয়াম। তবে এরা দেখতে গোলাপি রঙের হাওয়াই মিঠাইয়ের মতো নয়; আকাশে মেঘের উপস্থিতির ওপর ভিত্তি করে এরা সাদা বা নীল হতে পারে। এদের আসল রাসায়নিক গঠন নিশ্চিতভাবে জানতে নাসার জেমস ওয়েব স্পেস টেলিস্কোপের (JWST) পর্যবেক্ষণের জন্য অপেক্ষা করতে হবে।
মহাবিশ্বে এই ধরনের সুপার-পাফ গ্রহ বেশ বিরল। নাসার খাতায় থাকা প্রায় ৬,৩০০টি নিশ্চিত এক্সোপ্ল্যানেটের মধ্যে ৪০টিরও কম এই ক্যাটাগরিতে পড়ে। বিজ্ঞানীরা মনে করেন, সদ্য জন্ম নেওয়া কোনো নক্ষত্রের চারপাশের গ্যাস আর ধুলোর চাকতি থেকেই এদের জন্ম। যেখানে ধুলোর চেয়ে গ্যাসের পরিমাণ বেশি থাকে, সেখানে অতি দ্রুত একটা কঠিন কেন্দ্রের চারপাশে বিশাল গ্যাসীয় বায়ুমণ্ডল তৈরি হয় এবং সময়ের সাথে সাথে এরা তাদের অনেক উপাদান হারিয়ে ফেলে।
এই ধরনের অদ্ভুত আর বিরল গ্রহগুলো নিয়ে গবেষণা করাটা আসলে মহাজাগতিক এক বিশাল পাজল মেলানোর মতোই। ড. ড্র্যান্সফিল্ডের কথায়, গ্রহ গঠনের রহস্যময় প্রক্রিয়ায় এগুলো একেকটা নতুন টুকরো যোগ করে। মহাবিশ্বের এই বিশালতায় আমাদের নিজেদের অস্তিত্ব এবং অবস্থান ঠিক কোথায়, তা বুঝতে এই অদ্ভুত জগৎগুলোই হয়তো একদিন আমাদের নতুন কোনো পথ দেখাবে। মহাকাশ নিয়ে আমাদের জানাশোনার পরিধি যে এখনো কতটা সীমিত, ইউক্লিডের বিশাল ক্যানভাস আর এই তুলোর মতো গ্রহগুলো যেন বারবার সেটাই মনে করিয়ে দেয়।
