মধ্যপ্রাচ্যের আগুনে পুড়ছে তেলের বাজার, ইউরোপসহ বিশ্বজুড়ে বৈদ্যুতিক গাড়ির অপ্রত্যাশিত উত্থান

মধ্যপ্রাচ্যের আগুনে পুড়ছে তেলের বাজার, ইউরোপসহ বিশ্বজুড়ে বৈদ্যুতিক গাড়ির অপ্রত্যাশিত উত্থান

ফেব্রুয়ারির শেষে ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বিমান হামলার পর বিশ্বজুড়ে জ্বালানি সরবরাহে যে নজিরবিহীন অচলাবস্থা তৈরি হয়েছে, তা সাধারণ মানুষের গাড়ির হিসাব-নিকাশ পুরোপুরি পালটে দিয়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম ব্যারেল প্রতি ১০০ ডলার ছাড়িয়ে গেছে, আর এই তেলের বাজারের আগুন পেট্রোল পাম্প হয়ে সরাসরি আঘাত হানছে ভোক্তাদের পকেটে। বাধ্য হয়েই মানুষ এখন বিকল্প খুঁজছে। রয়টার্সের হাতে আসা এক্সক্লুসিভ ডেটা বলছে, ইউরোপে নতুন ও সেকেন্ড-হ্যান্ড—উভয় ধরনের ইলেকট্রিক ভেহিক্যাল (ইভি) বা বৈদ্যুতিক গাড়ির চাহিদা হঠাৎ করেই রকেটের গতিতে বাড়ছে, যা যুদ্ধকালীন এই সংকটের মাঝেও ইউরোপের ঝিমিয়ে পড়া অটোমোবাইল শিল্পে এক অপ্রত্যাশিত লাইফলাইন নিয়ে এসেছে।

খুব বেশিদিন আগের কথা নয়, যখন চিত্রটা ছিল বেশ হতাশাজনক। ২০২৫ সালে ইউরোপে সম্পূর্ণ বৈদ্যুতিক গাড়ির বিক্রি ৩০% বাড়লেও, সামগ্রিকভাবে ইভি গ্রহণের হার গাড়ি নির্মাতাদের প্রত্যাশার চেয়ে অনেক পিছিয়ে ছিল। ফক্সওয়াগেন থেকে শুরু করে স্টেলান্টিসের মতো জায়ান্টরা ইভির বাজারে বিশাল চাহিদার আশায় যে বিপুল বিনিয়োগ করেছিল, তা অনেকটা বুমেরাং হয়ে দাঁড়ায়। অবিক্রীত গাড়ির কারণে গত বছর তাদের মাল্টি-বিলিয়ন ডলারের লোকসানের খাতা সামলাতে হয়েছে।

কিন্তু এখন প্রেক্ষাপট সম্পূর্ণ ভিন্ন। যুক্তরাজ্যভিত্তিক অক্টোপাস ইলেকট্রিক ভেহিক্যালের সিইও গুরজিৎ গ্রেওয়ালের ভাষায়, “এটি কোনো সাময়িক ওঠানামা নয়, বরং একটা টার্নিং পয়েন্ট।” গত এপ্রিলে তাদের নতুন ইভির চাহিদা ৯৫% এবং পুরোনো ইভির চাহিদা ১৬০% লাফিয়ে বেড়েছে। বিশেষ করে ব্রিটেন, যারা মূলত জ্বালানি আমদানিনির্ভর, সেখানে মূল্যস্ফীতি আর খাদ্যের দাম বাড়ার ধাক্কাটা সাধারণ মানুষকে একটু বেশিই হজম করতে হচ্ছে। ফলে তেলের বিকল্প হিসেবে ইভি এখন তাদের কাছে অনেক বেশি বাস্তবসম্মত সমাধান।

রিসার্চ গ্রুপ ‘নিউ অটোমোটিভ’ এবং ‘ই-মোবিলিটি ইউরোপ’-এর তথ্য অনুযায়ী, গত এপ্রিলে ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং ইএফটিএ-ভুক্ত ১৬টি মূল বাজারে (যা মোট বিক্রির ৮০ শতাংশের বেশি নিয়ন্ত্রণ করে) নতুন ইভির নিবন্ধন এক ধাক্কায় ৩৪% বেড়েছে। ডেনমার্ক বা নেদারল্যান্ডসের মতো দেশগুলোতে বৈদ্যুতিক গাড়ি আগে থেকেই জনপ্রিয়, সেখানে বিক্রি তো বেড়েছেই; এমনকি ইতালির মতো বাজার—যেখানে ইভির চল বেশ ধীরগতির ছিল—সেখানেও রীতিমতো ধুম পড়েছে।

সুইডিশ গাড়ি নির্মাতা ভলভো কারস-এর চিফ কমার্শিয়াল অফিসার এরিক সেভেরিনসন জানান, তাদের অর্ডার লাফিয়ে বাড়ছে, বিশেষ করে এন্ট্রি-লেভেলের ছোট ‘EX30’ ইলেকট্রিক এসইউভি-র ক্ষেত্রে। কারণ তেলের দাম বাড়লে এই এন্ট্রি-লেভেলের ক্রেতারাই সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েন। তিনি আরও যোগ করেন, “এমনকি দক্ষিণ ইউরোপের যেসব দেশে ইভির পেনিট্রেশন তুলনামূলক কম, সেখান থেকেও আমাদের ফুল-ইলেকট্রিক গাড়িগুলোর ব্যাপারে প্রচুর ক্রেতা খোঁজখবর নিচ্ছেন।”

বৈশ্বিক ক্যানভাসে ইভি বিপ্লবের নতুন মাত্রা

ইউরোপের এই আকস্মিক উত্থান আসলে বৈশ্বিক ইভি বাজারের বৃহত্তর একটি ক্যানভাসেরই অংশ। ইন্টারন্যাশনাল এনার্জি এজেন্সির (IEA) সদ্য প্রকাশিত ‘গ্লোবাল ইভি আউটলুক’ রিপোর্টেও ঠিক এমন চিত্রই উঠে এসেছে। ২০২৬ সালে বিশ্বব্যাপী বিক্রি হওয়া মোট গাড়ির প্রায় ৩০ শতাংশই হবে বৈদ্যুতিক—সংখ্যায় যা প্রায় ২ কোটি ৩০ লাখ।

গত বছর, অর্থাৎ ২০২৫ সালটা ইভির জন্য একটা দারুণ বছর ছিল। সে বছর বিশ্বব্যাপী ইভি বিক্রি ২০% বেড়ে ২ কোটি ছাড়িয়ে যায়, যার মানে হলো ওই বছর রাস্তায় নামা প্রতি চারটি নতুন গাড়ির একটি ছিল বৈদ্যুতিক। প্রায় ৪০টি দেশে মোট গাড়ি বিক্রির অন্তত ১০% ছিল ইভি। উৎপাদনের দিক থেকে রীতিমতো রাজত্ব করেছে চীনা কোম্পানিগুলো, যারা বৈশ্বিক বিক্রির ৬০% সরবরাহ করেছে। অন্যদিকে ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকার হিস্যা ছিল ১৫% করে।

মজার ব্যাপার হলো, ২০২৬ সালের প্রথম প্রান্তিকে চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের পলিসি পরিবর্তনের কারণে বিশ্বব্যাপী ইভি বিক্রি ৮% কমে যায়। কিন্তু গ্লোবাল গড়ের এই পতনের আড়ালে অন্য অঞ্চলগুলোতে যে নীরব বিপ্লব ঘটে গেছে, তা অনেকেরই নজর এড়িয়েছে। ওই একই সময়ে ইউরোপে বিক্রি বেড়েছে প্রায় ৩০%, চীন বাদে এশিয়া প্যাসিফিকে বিক্রি লাফিয়েছে ৮০%, আর ল্যাটিন আমেরিকায় ৭৫%। গত মার্চ মাসেই বিশ্বের প্রায় ৯০টি দেশে ইভি বিক্রির সূচক ঊর্ধ্বমুখী ছিল, যার মধ্যে অন্তত ৩০টি দেশে মাসিক বিক্রির সর্বকালের রেকর্ড ভেঙে গেছে।

বাজারের এই গতিপ্রকৃতি বলে দিচ্ছে, প্রধান বাজারগুলোতে ইভি এখন আর কেবল পরিবেশ রক্ষার হাতিয়ার নয়, বরং জ্বালানির অস্থিতিশীল বাজারের বিপরীতে একটা শক্ত অর্থনৈতিক ঢাল। কোনো নতুন সরকারি পলিসি বা প্রণোদনা ছাড়াই, ২০৩৫ সালের মধ্যে বিশ্বব্যাপী ইভির বহর (দুই ও তিন চাকার যান বাদে) বর্তমানের প্রায় ৮ কোটি থেকে বেড়ে ৫১ কোটিতে গিয়ে ঠেকবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

আইইএ-র নির্বাহী পরিচালক ফাতিহ বিরল পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করে বলেন, “ইতিহাসের সবচেয়ে বড় তেল সরবরাহ সংকটের মাঝে ইভির এই ক্রমবর্ধমান জনপ্রিয়তা পুরো জ্বালানি ব্যবস্থায় কিছুটা হলেও স্বস্তি দিচ্ছে।” একদিকে ব্যাটারির দাম কমে আসা, অন্যদিকে বিশ্বব্যাপী জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় সম্ভাব্য নীতিগত পরিবর্তন—সব মিলিয়ে ইভির বাজার যে সামনের দিনগুলোতে আরও আগ্রাসী হয়ে উঠবে, তার স্পষ্ট আভাসই পাওয়া যাচ্ছে। তেলের বাজারের এই ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতা শেষ পর্যন্ত কোথায় গিয়ে থামবে তা হয়তো এখনই বলা মুশকিল, তবে ভোক্তার অভ্যাসে যে দীর্ঘমেয়াদী বদল আসতে শুরু করেছে, তার প্রভাব অটোমোবাইল শিল্পে বহু বছর ধরে অনুভূত হবে।

বাণিজ্য