নর্ডিক বাজারে ওপ্পোর নতুন হিসাব-নিকাশ
ইউরোপের বাজারে, বিশেষ করে নর্ডিক অঞ্চলে ওপ্পো যেন একটু বেশিই আটঘাট বেঁধে নেমেছে। বাজারে জোর গুঞ্জন, তারা নাকি নির্দিষ্ট কিছু ইউরোপীয় দেশে ওয়ানপ্লাসের জায়গা নিতে চলেছে। কথাটা পুরোপুরি সত্য কি না, সেটা হয়তো এখনই নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না। কিন্তু ওপ্পোর সাম্প্রতিক পদক্ষেপগুলো দেখলে পরিষ্কার বোঝা যায়, তারা একটা বড় ধরনের আক্রমণের প্রস্তুতি নিচ্ছে। আর এই আক্রমণভাগের একেবারে সামনে আছে তাদের নতুন এআই-নির্ভর ফ্ল্যাগশিপ—ওপ্পো ফাইন্ড এক্স৯ প্রো (Oppo Find X9 Pro)। ফোনটা দেখতে অনেকটা কিছুদিন আগে বাজারে আসা ওয়ানপ্লাসের মতোই। তবে একটা বড় পার্থক্য হলো হ্যাসেলব্লাড (Hasselblad)-এর সাথে এদের পার্টনারশিপ। এই ঐতিহাসিক ক্যামেরা ব্র্যান্ডের সিগনেচার ফিল্টার আর শুটিং মোডগুলো এই ফোনেও থাকছে, যা ফটোগ্রাফি ভক্তদের জন্য বেশ বড় একটা পাওয়া।
স্পেসিফিকেশনের লড়াইয়ে ফাইন্ড এক্স৯ প্রো
ডিজাইনের দিক থেকে ওপ্পো বরাবরই অ্যান্ড্রয়েড বাজারে একটু ঝুঁকি নিতে পছন্দ করে। ফাইন্ড এক্স৯ প্রো হয়তো সে অর্থে খুব বড় কোনো জুয়া নয়, কিন্তু স্পেসিফিকেশনের দিক থেকে এরা কোনো ছাড় দেয়নি। ৬.৭ ইঞ্চির এলটিপিও অ্যামোলেড (LTPO AMOLED) ডিসপ্লে, ১২০ হার্টজ রিফ্রেশ রেট আর ৩৬০০ নিটসের পিক ব্রাইটনেস—সব মিলিয়ে দারুণ একটা প্যাকেজ। কিন্তু আসল চমকটা এর ভেতরে। মিডিয়াটেকের ৩ ন্যানোমিটার আর্কিটেকচারের ডাইমেনসিটি ৯৫০০ (Dimensity 9500) চিপসেটের সাথে ১৬ জিবি LPDDR5X র্যাম এবং ৫১২ জিবি UFS 4.0 স্টোরেজ ফোনটাকে রীতিমতো একটা বিস্টে পরিণত করেছে।
ব্যাটারির কথা বললে তো চোখ কপালে ওঠার জোগাড়—৭,০০০ মিলিঅ্যাম্পিয়ারেরও বেশি ক্ষমতার ব্যাটারি! সাথে ৮০ ওয়াটের ওয়্যার্ড এবং ৫০ ওয়াটের ওয়্যারলেস চার্জিং। আইপি৬৯ (IP69) রেটিং, ব্লুটুথ ৬.০ আর ওয়াই-ফাই ৭-এর মতো ফিচারগুলো একে প্রতিযোগিতার দৌড়ে অনেকটাই এগিয়ে রাখবে। দাম হয়তো ১,০০০ ডলারের ওপরেই হবে, তবে স্যামসাং গ্যালাক্সি আল্ট্রার চেয়ে এটা সস্তাই হওয়ার কথা।
পিছনের বেশ উঁচু ক্যামেরা মডিউলের দিকে তাকালে মনে প্রশ্ন জাগতে পারে, এর ভেতরে আসলে কী আছে? এটি একটি ট্রিপল ক্যামেরা সিস্টেম। প্রাইমারি শুটার হিসেবে আছে সনির LYT828 সেন্সরের ৫০ মেগাপিক্সেল ক্যামেরা, সাথে ৫০ মেগাপিক্সেলের আল্ট্রা-ওয়াইড আর একেবারে নিচের দিকে আছে একটা দানবীয় ২০০ মেগাপিক্সেলের পেরিস্কোপ টেলিফটো লেন্স। তবে আক্ষেপের জায়গা হলো, এই পেরিস্কোপ লেন্সে মাত্র ৩এক্স অপটিক্যাল জুম দেওয়া হয়েছে। যেখানে আগে গ্যালাক্সি আল্ট্রা সিরিজে ১০এক্স পর্যন্ত জুম দেখা যেত, সেখানে এটা একটু কমই মনে হয়। তবে ওপ্পো হয়তো দাবি করবে, লেন্সের রিফাইনমেন্টের কারণে ফিজিক্যাল অপটিক্যাল জুম এখন আর ততটা জরুরি নয়। তাছাড়া যাদের সত্যিকারের অপটিক্যাল জুম দরকার, তাদের জন্য আল্ট্রা ভার্সনে ১৩এক্স পর্যন্ত অপটিক্যাল জুমের মডিউল তো থাকছেই। এখন দেখার বিষয়, নর্ডিক বাজারের প্রতিষ্ঠিত জায়ান্টদের সাথে দাম আর ফিচারের এই লড়াইয়ে ফোনটা কতটা টিকে থাকতে পারে।
আপার মিড-রেঞ্জে রেনো ১৬ সিরিজের দাপট
ফ্ল্যাগশিপের পাশাপাশি আপার মিড-রেঞ্জ মার্কেটটাও ওপ্পো নিজেদের দখলে রাখতে চাইছে। আর এই মিশনে তাদের হাতিয়ার হলো নতুন রেনো ১৬ (OPPO Reno16) সিরিজ। প্রিমিয়াম বিল্ড কোয়ালিটি, দানবীয় ব্যাটারি আর শক্তিশালী ক্যামেরার একটা চমৎকার ব্যালেন্স করার চেষ্টা করা হয়েছে এই লাইনআপে। মেটাল ফ্রেম আর গ্লাস ব্যাক ডিজাইনের এই সিরিজের স্ট্যান্ডার্ড মডেলে আছে ৬.৩২ ইঞ্চির ফ্ল্যাট ডিসপ্লে আর ডাইমেনসিটি ৮-সিরিজের প্রসেসর। ৬,৭০০ মিলিঅ্যাম্পিয়ার ব্যাটারির সাথে ৮০ ওয়াটের ফাস্ট চার্জিং থাকছে এতে। স্ট্যান্ডার্ড মডেলে প্রাইমারি ক্যামেরা হিসেবে ২০০ মেগাপিক্সেল সেন্সরের পাশাপাশি ৫০ মেগাপিক্সেলের আল্ট্রা-ওয়াইড এবং ৫০ মেগাপিক্সেলের পেরিস্কোপ লেন্স দেওয়া হয়েছে। এটি হার্টবিট স্টার, স্টারি পার্পল এবং মুনলিট ব্ল্যাক রঙে পাওয়া যাবে, আর স্টোরেজ অপশন ১৬ জিবি র্যাম এবং ১ টেরাবাইট পর্যন্ত যেতে পারে।
তবে সত্যিকারের নজর কাড়বে রেনো ১৬ প্রো (Reno16 Pro)। চারদিকে মাত্র ১.১৫ মিলিমিটারের অতি-পাতলা বেজেল আর ৬.৭৮ ইঞ্চির বড় ডিসপ্লে ফোনটাকে একটা প্রিমিয়াম লুক দিয়েছে। ভেতরে থাকছে ডাইমেনসিটি ৯৫০০এস (Dimensity 9500s) প্রসেসর। এতেও ফাইন্ড এক্স৯ প্রো-এর মতো ৭,০০০ মিলিঅ্যাম্পিয়ারের বিশাল ব্যাটারি দেওয়া হয়েছে, সাথে ৮০ ওয়াট ওয়্যার্ড আর ৫০ ওয়াট ওয়্যারলেস চার্জিংয়ের সুবিধা। এর ক্যামেরা সেটআপটাও বেশ শক্তিশালী—মেইন সেন্সরটা ২০০ মেগাপিক্সেলের (HP5), আর সাথে আছে ৫০ মেগাপিক্সেলের আল্ট্রা-ওয়াইড এবং ৫০ মেগাপিক্সেলের পেরিস্কোপ টেলিফটো (JN5)। প্রো মডেলের কালার অপশনে স্টারি পার্পলের বদলে থাকছে ড্রিম ব্লু, আর স্টোরেজ কনফিগারেশন ১২জিবি+২৫৬জিবি থেকে শুরু হয়ে ১৬জিবি+৫১২জিবি পর্যন্ত যাবে।
আগামী ২৫ মে ওপ্পো প্যাড ৬ বাজারে আসার কথা নিশ্চিত করা হয়েছে। অর্থাৎ বোঝাই যাচ্ছে, আগামী কয়েকদিন ওপ্পোর একের পর এক ইভেন্ট লেগেই থাকবে। আর এই ইভেন্টগুলোর ফাঁকেই যদি রেনো ১৬ সিরিজের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা চলে আসে, তবে অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না। সব মিলিয়ে, প্রথাগত হিসাব-নিকাশের বাইরে গিয়ে ওপ্পো এবার নিজেদের একটা শক্ত অবস্থান তৈরি করতে মাঠে নেমেছে, সেটা বেশ স্পষ্ট।
