বিশ্ববাজারে অস্থিরতা ও চড়া তেলের দামের প্রভাব, নিম্নমুখী সোনার দর

বিশ্ববাজারে অস্থিরতা ও চড়া তেলের দামের প্রভাব, নিম্নমুখী সোনার দর

সঞ্চয় হোক বা নিছক অলংকার— বাঙালি জীবনে সোনার কদর সবসময়ই একটু আলাদা। কেনার ইচ্ছা থাকুক বা না থাকুক, সোনার দাম বাড়লে ক্রেতাদের কপালে যেমন চিন্তার ভাঁজ পড়ে, তেমনি একটু কমলে মন বেশ ফুরফুরে হয়ে ওঠে। বৃহস্পতিবার (২৩ এপ্রিল, ২০২৬) বাজারে সেই স্বস্তির বাতাস কিছুটা হলেও বইছে। তবে হলুদ ধাতুর এই দাম ওঠা-নামার পেছনে আন্তর্জাতিক বাজারের নানা অর্থনৈতিক হিসাব-নিকাশ, জোগান ও চাহিদার এক জটিল সমীকরণ লুকিয়ে থাকে।

কমেছে স্থানীয় বাজারের দর

আজ কলকাতায় সোনার দামে কিছুটা পতন লক্ষ্য করা গেছে। ২২ ক্যারেট হলমার্ক গয়নার দাম প্রতি গ্রামে ১৫ টাকা কমে দাঁড়িয়েছে ১৪,৫৭০ টাকায়, যা আগের দিনের চেয়ে ০.১০ শতাংশ কম। ১০ গ্রামের ক্ষেত্রে এই দাম এখন ১,৪৫,৭০০ টাকা। অন্যদিকে, খুচরা ২৪ ক্যারেট পাকা সোনার দাম প্রতি গ্রামে ২০ টাকা কমে ১৫,৩২৫ টাকা এবং ১০ গ্রামে ১,৫৩,২৫০ টাকা হয়েছে। পাকা সোনার বাটের ক্ষেত্রেও একই চিত্র দেখা যাচ্ছে। প্রতি গ্রামে ২০ টাকা কমে এটি এখন ১৫,২৫০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে, ফলে ১০ গ্রামের দাম দাঁড়াচ্ছে ১,৫২,৫০০ টাকা।

বিশ্ববাজারে সোনা ও শক্তিশালী ডলার

স্থানীয় বাজারে এই দরপতনের মূল কারণ বিশ্ববাজারের অস্থিরতা। আন্তর্জাতিক বাজারে স্পট গোল্ডের দাম ০.৩ শতাংশ কমে আউন্স প্রতি ৪,৭২৪.৫৪ ডলারে নেমে এসেছে। পাশাপাশি, আগামী জুনের জন্য মার্কিন গোল্ড ফিউচারস চুক্তির দামও ০.৩ শতাংশ কমে ৪,৭৩৪.৯০ ডলার হয়েছে। মার্কিন ডলারের দাম বেড়ে যাওয়ায় অন্যান্য মুদ্রা ব্যবহারকারীদের জন্য সোনা কেনা এখন বেশ ব্যয়বহুল হয়ে পড়েছে। একইসঙ্গে, বেঞ্চমার্ক ১০-বছর মেয়াদি মার্কিন ট্রেজারি ইয়েল্ড গত এক সপ্তাহের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছানোয় বিনিয়োগকারীদের কাছে সোনার আবেদন কিছুটা ফিকে হয়েছে।

ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনা এবং তেলের বাজার

সোনার বাজারের এই টানাপোড়েনের পেছনে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার থমকে থাকা আলোচনা একটি বড় প্রভাবক হিসেবে কাজ করছে। হরমুজ প্রণালীতে ইরান সম্প্রতি দুটি জাহাজ জব্দ করে এই কৌশলগত জলপথের ওপর নিজেদের নিয়ন্ত্রণ আরও শক্ত করেছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প আক্রমণ অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিত রাখার ঘোষণা দিলেও, শান্তি আলোচনা পুনরায় শুরু হওয়ার কোনো লক্ষণ আপাতত নেই। উল্টো, সমুদ্রপথে বাণিজ্যে অবরোধ বজায় রাখার অভিযোগ তুলে ওয়াশিংটনের কড়া সমালোচনা করেছে তেহরান। দুই দেশের এই অচলাবস্থার জেরে ব্রেন্ট ক্রুড অয়েলের দাম ব্যারেল প্রতি ১০০ ডলার ছাড়িয়ে গেছে।

মূল্যস্ফীতির শঙ্কা ও সুদের হার

জ্বালানির এই চড়া দাম বিশ্বব্যাপী মূল্যস্ফীতির চাপ আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে। রয়টার্সের এক জরিপে অর্থনীতিবিদরা জানিয়েছেন, যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে তৈরি হওয়া জ্বালানি সংকটের জেরে মার্কিন ফেডারেল রিজার্ভ সম্ভবত এই বছর সুদের হার কমানোর আগে অন্তত ছয় মাস পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করবে। সাধারণত সোনাকে মূল্যস্ফীতির বিরুদ্ধে নিরাপদ বিনিয়োগ হিসেবে ভাবা হলেও, সুদের হার বেশি থাকলে এই ধাতু থেকে কোনো বাড়তি মুনাফা না আসায় বিনিয়োগকারীরা নিরুৎসাহিত হন।

ভবিষ্যৎ পূর্বাভাস

স্যাক্সো ব্যাংকের কমোডিটি স্ট্র্যাটেজি প্রধান ওলে হ্যানসেন বিষয়টি চমৎকারভাবে ব্যাখ্যা করেছেন। তাঁর মতে, সোনার বাজার এখন অনেকটাই তেলের বাজারের ওপর নির্ভরশীল। জ্বালানির ক্রমবর্ধমান খরচ ডলারকে শক্তিশালী করছে এবং মূল্যস্ফীতির ঝুঁকি উসকে দিচ্ছে। তবে বর্তমান এই দরপতনকে বড় কোনো কাঠামোগত পরিবর্তন হিসেবে দেখছেন না তিনি। হ্যানসেন মনে করেন, সুদের হার নিয়ে অনিশ্চয়তার কারণেই এই সাময়িক বিরতি চলছে এবং চলতি বছরের শেষদিকে বা ২০২৭ সালের শুরুর দিকে সোনা আবারও দামের দিক থেকে নতুন রেকর্ড গড়তে পারে।

বাণিজ্য